০৬:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম এখন হাজার কোটি টাকার মালিক

সোনারগাঁ উপজেলা  আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি এবং পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান  ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। এক সময় নুন আনতে পান্তা ফুরানো  এই জনপ্রতিনিধির সেই  ইউপি চেয়ারম্যানের উত্থানের কাহিনি যেন আরব্য রজনীর গল্পকেও হার মানায়।

বিপুল অর্থ ব্যয় করে বাগিয়ে নিয়েছেন । বর্তমানে তিনি সোনারগাঁ তথা নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের অঘোষিত এমপি। তার কথাই এখানে শেষ কথা। বিশাল সিন্ডিকেট করে জনপ্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিই এখন তার ধ্যান-জ্ঞান।

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল সোনারগাঁয়ে একচ্ছত্র চাঁদাবাজি করে যাচ্ছেন চেয়ারম্যান মাসুম। শুধু তাই নয়, অসহায় কৃষকদের জমি জাল-জালিয়াতি করে হাতিয়ে নিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি চড়া দামে বিক্রি করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন মাসুম। মেঘনা নদীর পাশে সোনাউল্লাহ মৌজায় গোটা একটি চর এভাবে কৃষকদের কাছ থেকে নামমাত্র দামে জোর করে কিনে এখন তিনি সেটা বালু দিয়ে ভরাটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পিরোজপুর এলাকার একটি খালও তিনি ভরাট করতে শুরু করেছেন।

এছাড়া মাসুমের বিরুদ্ধে মেঘনা শিল্পাঞ্চল এলাকার একাধিক স্কুলের ছাত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগও রয়েছে। ছাত্রীদের সঙ্গে তার অশ্লীল কথাবার্তার একাধিক অডিও ভাইরাল হয়েছে। এসব ছাত্রীর অভিভাবকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি মামলাও করতে দেননি। এতকিছুর পরও তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন।

মাসুমের এসব অপকর্ম তদন্তে যারা আসেন, তাদেরই পকেট ভারী হয়। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখে না। নিজের পক্ষে সংবাদ প্রকাশের জন্য তিনি কিছু ইউটিউবার ও নামসর্বস্ব পত্রিকার সাংবাদিককেও নিযুক্ত করেছেন। তাদের কাজই হলো মাসুমের পক্ষে প্রচার চালানো। সরকারি অনুদানের টাকা বিতরণের খবরও তারা এমনভাবে প্রকাশ করে যেন, মাসুম নিজের জমি বিক্রি করে সেই টাকা গরিব-দুঃখীর মাঝে বিতরণ করছেন। নানা তদবিরে ঢাকায় থাকতে হয় বলে সম্প্রতি তিনি কোটি টাকা দিয়ে ধানমন্ডিতে একটি ফ্ল্যাটও কিনেছেন।

পিরোজপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, মেঘনা নদীতে জেটি তৈরির অজুহাতে বড় বড় কয়েকটি কার্গো জাহাজের মাধ্যমে ইট, পাথর, বালু দিয়ে নদীর একাংশ দখল করে নিচ্ছেন মাসুম। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তিনি নদী দখল ও ভরাট করছেন।

স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে মাসুম চেয়ারম্যানের। প্রথমবার সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থী রফিকুল ইসলামের কাছে বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি নৌকা প্রতীক পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। মেঘনা গ্রুপ, আল মোস্তফাসহ ওই ইউনিয়নের যে কোনো কোম্পানির জমি ক্রয়-বিক্রয়, বালু ভরাট ও দখল বাণিজ্যে মেতে ওঠেন মাসুম। তার হুকুম ছাড়া এসব কোম্পানিতে কোনো কাজই হয় না।

এছাড়া মেঘনা শিল্পনগরী এলাকায় অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানার ঝুট ব্যবসা থেকে শুরু করে সবকিছু তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন। এভাবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মেঘনা এলাকায় একাধিক বহুতল ভবন, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, নামে-বেনামে প্রচুর জমিজমা, একাধিক গাড়িসহ প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। এর আগে অবৈধ সম্পদের হিসাব চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে নোটিশ দিয়েছিল। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্তি পান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিরোজপুরের এক বাসিন্দা জানান, এক সময়ে মাসুম চেয়ারম্যানের নুন আনতে পান্তা ফুরাত। অথচ আজ তিনি কয়েক বছরের ব্যবধানে বাড়ি, গাড়িসহ অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।

ইসলামপুরের আরেক বাসিন্দা জানান, কোনো ব্যক্তি যদি ওয়ারিশ সার্টিফিকেটের জন্য মাসুম চেয়াম্যানের কাছে যান, তাহলে তিনি সার্টিফিকেট না দিয়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ওই সম্পত্তি নিজের নামে নিয়ে পরে কোম্পানির কাছে বেশি দামে বিক্রি করে দেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুমকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানা ফেরদৌস জানান, মেঘনা সেতুর কমপক্ষে ছয় কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন বা নদী ভরাটের কোনো নীতিমালা নেই। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বালু উত্তোলন বা ভরাটের কারণে সেতুর যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানকে এর দায়ভার নিতে হবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নারায়ণগঞ্জের এক কর্মকর্তা জানান, নদী ভরাটের বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দখলকারীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নাসির উদ্দিন ঝিলু, আরিফুর রহমান, রোকসানা বেগম, নির্বাচিত

ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম এখন হাজার কোটি টাকার মালিক

প্রকাশ: ০৮:৩৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ মে ২০২৪

সোনারগাঁ উপজেলা  আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি এবং পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান  ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। এক সময় নুন আনতে পান্তা ফুরানো  এই জনপ্রতিনিধির সেই  ইউপি চেয়ারম্যানের উত্থানের কাহিনি যেন আরব্য রজনীর গল্পকেও হার মানায়।

বিপুল অর্থ ব্যয় করে বাগিয়ে নিয়েছেন । বর্তমানে তিনি সোনারগাঁ তথা নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের অঘোষিত এমপি। তার কথাই এখানে শেষ কথা। বিশাল সিন্ডিকেট করে জনপ্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিই এখন তার ধ্যান-জ্ঞান।

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল সোনারগাঁয়ে একচ্ছত্র চাঁদাবাজি করে যাচ্ছেন চেয়ারম্যান মাসুম। শুধু তাই নয়, অসহায় কৃষকদের জমি জাল-জালিয়াতি করে হাতিয়ে নিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি চড়া দামে বিক্রি করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন মাসুম। মেঘনা নদীর পাশে সোনাউল্লাহ মৌজায় গোটা একটি চর এভাবে কৃষকদের কাছ থেকে নামমাত্র দামে জোর করে কিনে এখন তিনি সেটা বালু দিয়ে ভরাটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পিরোজপুর এলাকার একটি খালও তিনি ভরাট করতে শুরু করেছেন।

এছাড়া মাসুমের বিরুদ্ধে মেঘনা শিল্পাঞ্চল এলাকার একাধিক স্কুলের ছাত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগও রয়েছে। ছাত্রীদের সঙ্গে তার অশ্লীল কথাবার্তার একাধিক অডিও ভাইরাল হয়েছে। এসব ছাত্রীর অভিভাবকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি মামলাও করতে দেননি। এতকিছুর পরও তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন।

মাসুমের এসব অপকর্ম তদন্তে যারা আসেন, তাদেরই পকেট ভারী হয়। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখে না। নিজের পক্ষে সংবাদ প্রকাশের জন্য তিনি কিছু ইউটিউবার ও নামসর্বস্ব পত্রিকার সাংবাদিককেও নিযুক্ত করেছেন। তাদের কাজই হলো মাসুমের পক্ষে প্রচার চালানো। সরকারি অনুদানের টাকা বিতরণের খবরও তারা এমনভাবে প্রকাশ করে যেন, মাসুম নিজের জমি বিক্রি করে সেই টাকা গরিব-দুঃখীর মাঝে বিতরণ করছেন। নানা তদবিরে ঢাকায় থাকতে হয় বলে সম্প্রতি তিনি কোটি টাকা দিয়ে ধানমন্ডিতে একটি ফ্ল্যাটও কিনেছেন।

পিরোজপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, মেঘনা নদীতে জেটি তৈরির অজুহাতে বড় বড় কয়েকটি কার্গো জাহাজের মাধ্যমে ইট, পাথর, বালু দিয়ে নদীর একাংশ দখল করে নিচ্ছেন মাসুম। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তিনি নদী দখল ও ভরাট করছেন।

স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে মাসুম চেয়ারম্যানের। প্রথমবার সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থী রফিকুল ইসলামের কাছে বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি নৌকা প্রতীক পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। মেঘনা গ্রুপ, আল মোস্তফাসহ ওই ইউনিয়নের যে কোনো কোম্পানির জমি ক্রয়-বিক্রয়, বালু ভরাট ও দখল বাণিজ্যে মেতে ওঠেন মাসুম। তার হুকুম ছাড়া এসব কোম্পানিতে কোনো কাজই হয় না।

এছাড়া মেঘনা শিল্পনগরী এলাকায় অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানার ঝুট ব্যবসা থেকে শুরু করে সবকিছু তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন। এভাবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মেঘনা এলাকায় একাধিক বহুতল ভবন, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, নামে-বেনামে প্রচুর জমিজমা, একাধিক গাড়িসহ প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। এর আগে অবৈধ সম্পদের হিসাব চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে নোটিশ দিয়েছিল। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্তি পান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিরোজপুরের এক বাসিন্দা জানান, এক সময়ে মাসুম চেয়ারম্যানের নুন আনতে পান্তা ফুরাত। অথচ আজ তিনি কয়েক বছরের ব্যবধানে বাড়ি, গাড়িসহ অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।

ইসলামপুরের আরেক বাসিন্দা জানান, কোনো ব্যক্তি যদি ওয়ারিশ সার্টিফিকেটের জন্য মাসুম চেয়াম্যানের কাছে যান, তাহলে তিনি সার্টিফিকেট না দিয়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ওই সম্পত্তি নিজের নামে নিয়ে পরে কোম্পানির কাছে বেশি দামে বিক্রি করে দেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুমকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানা ফেরদৌস জানান, মেঘনা সেতুর কমপক্ষে ছয় কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন বা নদী ভরাটের কোনো নীতিমালা নেই। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বালু উত্তোলন বা ভরাটের কারণে সেতুর যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানকে এর দায়ভার নিতে হবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নারায়ণগঞ্জের এক কর্মকর্তা জানান, নদী ভরাটের বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দখলকারীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।